পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার প্রবন্ধ রচনা

পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার

অন্ন চাই, প্রাণ চাই, আলো চাই, চাই মুক্ত বায়ু
চাই বল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ উজ্জ্বল পরামায়ু। – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভূমিকা:

উদ্ভিদ ও প্রাণি জগত সহ যে প্রাকৃতিক পরিবেস্টনের মধ্যে আমরা বাস করি, সাধারণভাবে তাকে বলা হয় পরিবেশ। সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য বিশুদ্ধ পরিবেশের একান্ত প্রয়োজন। মানুষ যেদিন প্রথম আগুন জ্বালাতে শিখল সেদিন থেকেই শুরু হল পরিবেশ দূষণ। প্রাকৃতিক বিশুদ্ধতা নষ্ট হওয়ার এই প্রক্রিয়াকে আমরা পরিবেশ দূষণ বলে থাকি। বিশ্বব্যাপী পরিবেশ দূষণের তীব্রতার ফলে মানব সভ্যতা একবিংশ শতাব্দীতে এক গভীর সংকটের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।

মানব সভ্যতার অগ্রগতি ও দূষণের সূত্রপাত:

মানব সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে পরিবেশ দূষণের সূত্রপাত আগুন আবিষ্কৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানব সভ্যতা কয়েক ধাপ এগিয়ে গেলেও সূচিত হলো প্রাণের ধাত্রী অক্সিজেনের ধ্বংসলীলা। নির্বিচারে বৃক্ষছেদন এবং নগনারায়ণ ধরিত্রীকে করে তুলল মরুর মতো রক্ষ, পবিত্র নদী বক্ষে নিক্ষেপিত হল কল কারখানার বিষাক্ত বজ্র পদার্থ। আনবিক ও পরমানবিক বোমার তেজস্ক্রিয় রশ্মি ছড়িয়ে পড়ল আকাশে বাতাসে। তাই বড় দুঃখ ও ব্যথায় মর্মস্পর্শী আবেদন-

দাও ফিরে সে অরণ্য, লহ এ নগর।

পরিবেশ দূষণের প্রকারভেদ:

সাধারণভাবে পরিবেশ দূষণ কে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। ১) প্রাকৃতিক দূষণ ২) মনুষ্যসৃষ্ট দূষণ। আগ্নেয়গিরির অগ্নুপাত, দাবানল, বালুঝড় প্রভৃতি কারণ গুলি হল প্রাকৃতিক দূষণ। এইসব প্রাকৃতিক দূষণের প্রতিকার সাধারণত প্রকৃতি নিজের হাতে করে দেয়। কিন্তু মনুষ্যসৃষ্ট দূষণ হলো মারাত্মক। যানবাহনের ধোয়া, কলকারখানার দূষিত বজ্র পদার্থ, রাসায়নিক ব্যবহার, পারমাণবিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যুদ্ধ আরো নানা কারণে পৃথিবী ভয়ংকর ভাবে দূষিত হয়ে চলেছে। দূষণ বলতে তাই মনুষ্যসৃষ্ট দূষণকে বোঝানো হয়ে থাকে। আমরা বলতে পারি- God made the country and man made the town. মনুষ্য সৃষ্টি এই পরিবেশ দূষণকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়। যথা- জল দূষণ, বায়ু দূষণ, ভূমি দূষণ, শব্দ দূষণ প্রভৃতি।

বায়ুদূষণ:

বিশুদ্ধ বাতাস ছাড়া মানুষ সুস্থ ভাবে বাঁচতে পারেনা। অসংখ্য যানবাহন ও কলকারখানা থেকে প্রতিমুহূর্তে নিগ্রদ দূষিত ধোঁয়া বাতাসে কার্বনডাই-অক্সাইড- এর মত দূষিত গ্যাস ছড়িয়ে দিয়ে বায়ুমণ্ডলকে দূষিত করে চলেছে। এর ফলে কমে যাচ্ছে জীবনদায়ী অক্সিজেন এর পরিমাণ।

জলদূষণ:

জলই জীবন। কলকারখানার দূষিত বজ্র পদার্থ, শস্যক্ষেত্রে ব্যবহৃত রাসায়নিক স্যার ও কীটনাশক ওষুধ- এইসব নানা কারণে প্রতিনিয়ত জল দূষণ ঘটে চলেছে। এই পরিনামে মানুষ ও জীবজগৎ নানাবিদ রোগের শিকার হচ্ছে। এমনকি পানীয় জল মানুষের প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে।

ভূমি দূষণ:

কৃষি ও শিল্প বিপ্লবী ভূমিদূষণের কারণ। কৃষিতে নানাভাবে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগের ফলে ভূমি দূষিত হচ্ছে। শিল্প কলকারখানার বজ্র পদার্থ ও শহর এলাকার আবর্জনার স্তুপ মাটিকে দূষিত করছে।

শব্দ দূষণ:

দূষণ শুধু বায়ুতে নয়, জলে নয়, শব্দেও। যানবাহনের হর্নে, কলকারখানার আওয়াজ, মাইকের আওয়াজ, বাজি পটকা শব্দ, আধুনিক জীবনের এক বড় সমস্যা। শব্দ দূষণের ফলে শ্রবণ ক্ষমতার বিলুপ ঘটে ,এমন কি মানসিক বিপর্যয় দেখা যায়।

বিশ্ব উষ্ণায়ন:

পরিবেশ দূষণের চরমতম রূপ হল বিশ্ব উষ্ণায়ন। সমগ্র বিশ্ব জুড়ে উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে চির হিমানির দেশেও বরফ গলবে। সমুদ্র উঠবে ফুলে- ফেপে। আর সূক্ষ্ম অঞ্চল হবে আরো সূক্ষ্মতার। এই সংকটের মুহূর্তে কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভাষায় বলা যায়-

এই নদী, এই মাটি বড় প্রিয় ছিল
এই মেঘ ,এই রৌদ্র, এই বাতাসের উপভোগ
আমরা অনেক দূরে সরে গেছি, কে কোথায় আছি।

👉 সমস্ত রচনা দেখতে: Click Here
প্রতিকার:

পরিবেশ দূষণ প্রতিকারের জন্য সর্বপ্রথম মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে। কলকারখানা, যানবাহন প্রভৃতি আধুনিক জীবনের উপকরণ গুলিকে আজ আর বর্জন করা সম্ভব নয়, সুতরাং অগ্রগতিকে বজায় রেখে কিভাবে দূষণ রোধ করা যায়, সে বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করার প্রয়োজন। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করার ক্ষেত্রে, বৃক্ষরোপণ ও বন সংরক্ষণের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। এ বিষয়ে বিশ্বের প্রতিটি দেশকে সহযোগিতামূলক মনভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

উপসংহার:

সুস্থ পরিবেশের উপরেই নির্ভর করেছে সুস্থ জীবন। সভ্যতার অগ্রগতির অন্ধ প্রতিযোগিতা থেকে ব্যক্তিগত সুখ ছন্দের মরিয়া তাগিত থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে হবে। প্রত্যেক বছর ৫ই জুন পরিবেশ দূষণ পালন করলেই হবে না, পরিবেশ দূষণের করাল গ্রাসকে প্রতিহত করার জন্য সকলকে সচেতন থাকতে হবে প্রতিমুহূর্তে। আমাদের শপথ নিয়ে সংকল্প করতে হবে-

যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
———- সুকান্ত ভট্টাচার্য

Leave a Comment